এ ঋণ কর্মসূচির অধীনে বেশকিছু শর্ত ও সংস্কার বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এর মধ্যে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করা ও নিট রিজার্ভ সংরক্ষণসংক্রান্ত শর্ত পূরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রয়েছে বেশ দুর্বলতা। প্রথম তিনটি রিভিউ মিশনে এ বিষয়ে ছাড় দেয়া হলেও চতুর্থ ও বর্তমানে চলমান মিশনে বেশ কঠোর অবস্থানে আইএমএফ। গুরুত্বপূর্ণ এসব শর্ত পূরণ করতে না পারলে ঋণের কিস্তির অর্থ না পাওয়ার শঙ্কাও রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আইএমএফের গবেষণা শাখার উন্নয়ন সামষ্টিক অর্থনীতি বিভাগের প্রধান ক্রিস পাপাজর্জিওর নেতৃত্বে গত ৬ এপ্রিল থেকে সংস্থাটির একটি মিশন বাংলাদেশ সফর করছে। এর আগের তিনটি মিশনেরও নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। এবারের মিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আগামী জুনে আইএমএফের পর্ষদে বাংলাদেশের ঋণের চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তির অর্থ ছাড়ের প্রস্তাব উঠবে। অনুমোদন সাপেক্ষে দুই কিস্তি মিলিয়ে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়ের কথা রয়েছে।
আইএমএফ মিশন এরই মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, বিপিডিবি, বিইআরসি, পেট্রোবাংলা, বিপিসিসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার সঙ্গে ঋণ কর্মসূচির অধীন বিভিন্ন সংস্কার ও শর্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করেছে। মিশনের প্রথম দিন সংস্থাটির কর্মকর্তারা অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ও অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের সঙ্গে বৈঠক করেন। শেষ দিন ১৭ এপিলও অর্থ উপদেষ্টা, অর্থ বিভাগের সচিব, এনবিআর চেয়ারম্যানসহ অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে আইএমএফ মিশনের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
ঋণ কর্মসূচির অধীনে বিভিন্ন সংস্কার ও শর্ত বাস্তবায়নের বিষয়টি মূল্যায়ন করাই আইএমএফ মিশনের উদ্দেশ্য হলেও এবার তাদের উদ্বেগ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণে ব্যর্থতা ও বাজারভিত্তিক বিনিময় হারের দিকে না যাওয়া নিয়ে। অর্থ উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকেও রাজস্ব আহরণ ও বাজেট ঘাটতির বিষয়টি নিয়ে আইএমএফের কর্মকর্তারা উদ্বেগ জানিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে এনবিআরের সঙ্গে হওয়া বৈঠকেও রাজস্ব আহরণে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে টার্নওভার কর, ন্যূনতম কর ও সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি (সম্পূরক শুল্ক) বাড়ানোর পাশাপাশি ভ্যাটের একক হার নির্ধারণে চাপ দেয় আইএমএফ মিশন। তাছাড়া কর অব্যাহতি বাতিলের জন্যও চাপ দেয়া হচ্ছে।
চলতি অর্থবছরের জন্য আইএমএফের বেঁধে দেয়া ৪ লাখ ৫৫ হাজার কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এখন পর্যন্ত ৯ মাসে ২ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণ সম্ভব হয়েছে। ফলে লক্ষ্য পূরণে অর্থবছরের শেষ তিন মাসে ২ লাখ কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব আদায় করতে হবে, যা বিদ্যমান বাস্তবতায় সম্ভব নয় বলে আইএমএফকে জানিয়েছে এনবিআর। তাছাড়া আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫৭ হাজার কোটি টাকার বাড়তি রাজস্ব আহরণে সরকারের কাছে পরিকল্পনা জানতে চেয়েছে আইএমএফ। বিদ্যমান বাস্তবতায় এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করাও বেশ কঠিন হবে বলে জানিয়েছেন এনবিআরের কর্মকর্তারা।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, সরকারের রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতি নিয়ে সন্তুষ্ট নয় আইএমএফ। যেকোনোভাবেই হোক রাজস্ব আহরণ বাড়িয়ে বাজেট ঘাটতি যাতে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় সেদিকে জোর দিতে বলেছেন মিশনে আসা কর্মকর্তারা। গতবারের মিশনের সময়ই আইএমএফের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের ঋণের পরিমাণ দিন দিন বাড়ার বিষয়টি উল্লেখ করে বাজেট ঘাটতি কমানোর কথা বলা হয়েছিল। এ অবস্থায় সরকারের পক্ষ থেকে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রার ক্ষেত্রে ছাড় দেয়ার অনুরোধ করা হলেও সংস্থাটির পক্ষ থেকে খুব বেশি ছাড় না দেয়ারই ইঙ্গিত মিলছে। এমনকি রাজস্ব আহরণ বাড়াতে সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার বিষয়ে সন্তুষ্ট না হলে ঋণের কিস্তির অর্থ আটকে যাওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে।
জানতে চাইলে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং দাতা সংস্থা উভয়ের অভিন্ন লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের রাজস্ব আদায় বাড়ানো। আমরা কর অব্যাহতি কমিয়ে, যৌক্তিক ও বৈষম্যহীন করহার নির্ধারণ করে, করের আওতা বাড়িয়ে, কর ফাঁকি উদঘাটন করে এবং কর ব্যবস্থার ডিজিটাইজেশনের মাধ্যমে কর প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে রাজস্ব আদায় বাড়াতে সক্ষম হব বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।’
এদিকে ঋণ কর্মসূচির শুরু থেকেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার জন্য বলে আসছে আইএমএফ। যদিও ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যেতে পারে এমন শঙ্কায় সরকার বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়নি। এর পরিবর্তে গত বছরের মে মাসে ক্রলিং পদ্ধতি চালু করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিনিময় হার স্থিতিশীল করতে এ নীতি কোনো কাজেই আসেনি। বরং দেশের মুদ্রাকে আরো বেশি অবমূল্যায়নের দিকে ঠেলে দিতেই ভূমিকা রেখেছে। ফলে এ বছরের শুরুতে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ক্রলিং পেগ নীতি থেকে সরে আসার কথা জানায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নতুন নিয়মে ব্যাংকগুলোর ডলারে লেনদেনের তথ্যের ভিত্তিতে দিনে দুবার ভিত্তিমূল্য বা রেফারেন্স প্রাইস নির্ধারণ করে দেয়ার কথা বলা হয়। গত ১২ জানুয়ারি থেকে এটি কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও এখনো সে অর্থে হয়নি। এর পরিবর্তে বর্তমানে আন্তঃব্যাংক ও গ্রাহকদের মধ্যে লেনদেনের ক্ষেত্রে বিনিময় হার চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতে ডিলার ব্যাংকের মাধ্যমে নির্ধারিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে ডিলার ব্যাংকগুলো একটি সীমার মধ্যে থেকে দরকষাকষির মাধ্যমে ডলারের দাম নির্ধারণ করছে। গত মাসে দেশে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স আসার ক্ষেত্রে নির্ধারিত দরের চেয়েও বেশি দামে ডলার কেনার বিষয়টি ভূমিকা রেখেছে। এক্ষেত্রে বাড়তি দরে ডলার কেনার বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীরব ভূমিকা রেখেছে।
আইএমএফের চলমান মিশনের পক্ষ থেকে অবশ্য ডলারের দাম বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়ার জন্য সরকারকে চাপ দেয়া হচ্ছে। যদিও মূল্যস্ফীতি বেড়ে যেতে পারে এ শঙ্কায় বাংলাদেশ ব্যাংক এখনই ডলারের দাম পুরোপুরি বাজারভিত্তিক করতে চাইছে না। তবে আইএমএফ বলছে পরীক্ষামূলকভাবে হলেও তা করতে। এক্ষেত্রে যদি ডলারের দাম বেশ বেড়ে যায় সেক্ষেত্রে বাজারে সরবরাহ বাড়াতে বাংলাদেশকে ঋণ কর্মসূচির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দেয়ার কথাও বলছে সংস্থাটি। অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংক চাইছে মে মাস পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে। বর্তমানে রফতানি আয় ও রেমিট্যান্সের ঊর্ধ্বমুখিতা এবং রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতির কারণে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করাটা তেমন কঠিন হবে না বলে মনে করছে সরকারও।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে দেশের অর্থনীতি ভালো অবস্থায় আছে। রফতানি আয় ও রেমিট্যান্স প্রবাহও বাড়ছে। এ অবস্থায় রিজার্ভ নিয়ে তেমন কোনো শঙ্কা নেই। ফলে বিনিময় হার আরো শিথিল করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে হয় না। আইএমএফ তাদের মতামত জানাবে, আমরাও আমাদের যুক্তি তুলে ধরব। এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে দরকষাকষির সুযোগ রয়েছে।’
সরকারের অর্থনৈতিক ও আর্থিক নীতির বিষয়ে আজ ও আগামীকাল আইএমএফের দুই দফায় মেমোরেন্ডামের খসড়া তৈরির কথা রয়েছে। সংস্থাটির বর্তমান মিশন শেষ হওয়ার দুইদিন পরই অর্থ উপদেষ্টা, অর্থ বিভাগের সচিবসহ সরকারের বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্র সফর করবেন। সেখানে ঋণ কর্মসূচির শর্ত নিয়ে আইএমএফের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আরেক দফা আলোচনা করা হবে। মূলত বিদ্যমান বাস্তবতায় রাজস্ব আহরণ ও বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করা সংক্রান্ত কঠিন শর্ত বাস্তবায়নের বিষয়টি নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের এ আলোচনায় দুই পক্ষের মধ্যে দরকষাকষি হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
গত বছরের ডিসেম্বরে আইএমএফের মিশন শেষে সংবাদ সম্মেলনে ক্রিস পাপাজর্জিও জানিয়েছিলেন, ঋণের কিস্তি ছাড়ের ক্ষেত্রে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি ও মুদ্রা বিনিময় হার নমনীয় করা সংক্রান্ত শর্ত পূরণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এ দুটি শর্ত পূরণের পরই তারা আইএমএফের পর্ষদে ঋণ প্রস্তাব উত্থাপন করবেন।
মিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে চলতি বছরের মার্চের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশের ঋণের চতুর্থ কিস্তির প্রস্তাব পর্ষদে ওঠার কথা থাকলেও পরে সেটি পিছিয়ে ১২ মার্চ করা হয়। তবে ঋণ কর্মসূচির আওতায় কিছু শর্ত পরিপালনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বাড়তি সময় চেয়ে অনুরোধ জানানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে আইএমএফ এ বছরের জুনে শর্ত পূরণ সাপেক্ষে একসঙ্গে চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তির অর্থ ছাড়ের বিষয়ে সম্মতি দেয়। তবে শর্ত পূরণ করতে না পারার কারণে এবারের কিস্তি আটকে গেলে এর প্রভাবে অন্যান্য ঋণদাতা সংস্থার কয়েক বিলিয়ন ডলারের অর্থায়নও ঝুলে যেতে পারে। ফলে ঝুঁকিতে পড়বে বাংলাদেশের কান্ট্রি রেটিংও। এ বাস্তবতায় সরকারের দিক থেকে যতটুকু সম্ভব শর্ত বাস্তবায়নের প্রচেষ্টার মাধ্যমে আইএমএফের সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা থাকবে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশের জন্য ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি আইএমএফের নির্বাহী বোর্ডের সভায় ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। সাত কিস্তিতে ৪২ মাসে এ ঋণ মিলবে। ঋণের গড় সুদের হার ২ দশমিক ২ শতাংশ।